শেখ হাসিনার জন্ম, বিয়ে ও জন্মদান কখনোই পাশে ছিলেন না বাবা Sheikh Hasina's birth, marriage and birth were never beside her father
শেখ
হাসিনার জন্ম, বিয়ে ও জন্মদান কখনোই
পাশে ছিলেন না বাবা
নিজেকে
নিঃশেষে বিলিয়ে দেবার উদাহরণ খুবই বিরল। আর তা যদি
হয় বাবা ও মেয়ের উভয়ের
ক্ষেত্রে তবে তো তা অতি
বিরল! মন্ত্রমুগ্ধের মতো গোটা বিশ্ব আজ যাকে অনুসরণ
করছেন সেই শেখ হাসিনার আজ জন্মদিন। বাংলাদেশের
প্রধানমন্ত্রী।
'৪৭
সালের এদিনে টুঙ্গীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। তার জীবন বড় বিচিত্র, বড়
ঘটনাবহুল। তিনি যখন নিভৃত পল্লী টুঙ্গীপাড়ায় জন্ম নেন তখন কাছে ছিলেন না পিতা শেখ
মুজিবুর রহমান।
'৬৭
সালে যখন তার বিয়ে তখন পিতা কারাগারে অন্তরীণ। '৭১ সালের ২৭
জুলাই যখন শেখ হাসিনা বন্দীদশা অবস্থায় পুত্র সন্তানের জন্ম দেন তখন পিতা ছিলেন পাকিস্তানি কারাগারে ফাঁসির হুকুমের আসামি।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ ক্লাসের
ছাত্রী শেখ হাসিনাকে উপাচার্য ড. আব্দুল মতিন
চৌধুরী ১৫ আগস্টের পরে
জার্মানীতে যেতে বলেছিলেন। ড. ওয়াজেদের জেদাজেদিতে
শেখ হাসিনাকে ঢাকা ত্যাগ করতে হয় ২৯ জুলাই
"৭৫। শেখ মুজিব ও ফজিলাতুন্নেসার
রেণুর বিয়ের গল্পটাও দারুণ। সে এক রূপকথার
গল্প।
শেখ
মুজিবের বয়স মাত্র ১৩। রেণুর বাবা মারা যাবার পরে শেখ মুজিবের পিতা শেখ লুৎফর রহমানকে বললেন,
"তোমার বড় ছেলের সঙ্গে
আমার এক নাতনীর বিবাহ
দিতে হবে। কারণ আমি সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাবো।"
রেণুর
দাদা শেখ লুৎফর রহমানের চাচা। মুরব্বী বলে কথা। শেখ মুজিবের সঙ্গে রেণুর বিবাহ রেজিস্ট্রি হলো। রেণুর বয়স তিন বছর। পাঁচ বছর বয়সে রেণু তার মা হারান। ফলে
সাত বছর বয়সে রেণুকে নিয়ে আসা হয় শেখ
মুজিবের মা সায়েরা খাতুনের
কাছে।
'৪২
সালে শেখ মুজিব ও শেখ ফজিলাতুন্নেসার
ফুলশয্যা হয়। যখন শেখ মুজিব রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছেন পুরোদমে। কলকাতা চলে যান এর পরপরই। জীবনের
এক মহামুহূর্ত দেখা দিল ২৮ সেপ্টেম্বর -১৯৪৭।
মুজিব-রেণু দম্পতির প্রথম সন্তান শেখ হাসিনা ভূমিষ্ঠ হলেন।
মানুষ
বেদনা ভিন্ন নয়, কিন্তু বেদনার ঊর্ধ্বেও আছে মানুষের গৌরব। শেখ হাসিনার জীবনের ঘটনাপ্রবাহ বড়ই বেদনা বিষাদময়। তার জন্মকালীন বেদনা ও আর্তি- বাবা
শেখ মুজিব কাছে ছিলেন না। দেশ বিভাগের ঘোরে তন্দ্রাবেশী শেখ মুজিব ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন কলকাতায়।
টেলিগ্রাম
পেয়েও সন্তান হবার খবরে খুশি হলেও ছুটে আসতে পারেননি সুশীতল ছায়াচ্ছন্ন টুঙ্গীপাড়ার নিজ ভিটেমাটিতে। প্রিয় সন্তান শেখ হাসিনার মুখ দর্শন করতে। চেতনা, প্রতিজ্ঞা ও স্বপ্ন নিয়ে
কাজ করবার দিন হয়ে উঠেছিল সেই সময়গুলো। উচ্ছ্বসিত কন্ঠ নিয়ে নয়, সঙ্কুচিত কন্ঠ নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন শেখ মুজিব। "আমার নেতা" বলে সম্মোহিত করা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কলকাতার পাঠ চুকিয়ে ঢাকায় ঘাট বাধেন শেখ মুজিব।
ভালোদিন
পথের বাঁকেই অপেক্ষা করছে, যেন একটু এগিয়ে যেতে হবে। দ্রুত মুজিবীয় কন্ঠের সাবলীল উচ্চারণ মানুষের মুখে মুখে, আড্ডায়-আলাপ ছাপিয়ে রাজনীতির মাঠে ময়দানের উপাদান হয়ে উঠলো। সেবক ও সহচরের সংখ্যা
দিনে দিনে বেড়ে অজেয় শক্তিতে পরিণত করলো। কিন্তু পরিবারের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্প্রীতির মায়াজাল তাতে ছিন্ন হলো। একজন ছিপেছিপে, দীর্ঘদেহী, ঘন ওল্টানো চুল
মাথায়, খবরের কাগজ হাতে দাঁড়ানো শেখ মুজিব বক্তৃতায় বক্তৃতায় একদিন স্বপ্ন দেখলেন বাঙালি জাতির দেশ ও রাষ্ট্রস্বপ্নের কথা।
'৫২
সালে শেখ মুজিবের পরিবারের ঢাকায় আসা। কবি সুফিয়া কামাল যেদিন নারী শিক্ষা মন্দিরে (বর্তমান শেরে-বাংলা বালিকা বিদ্যালয়) শেখ হাসিনার হাতে শিক্ষার প্রদীপ জ্বলে দিয়েছিলেন, সেদিনও মেয়ের পাশে ছিলেন না বাবা শেখ
মুজিব। আজকের যে প্রাণবন্ত একটি
মানুষ। যার হাসিমাখা শ্যামলীময়া মুখখানি তিনি মুহূর্তের মধ্যে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন বাবা শেখ মুজিবের ন্যায় ছিপছিপে দেহ নিয়ে তার চির অনাড়ম্বর পোশাকে তা তো ইতিহাসেরই
অপূর্ব যোগসূত্র। তিনি আওয়ামী লীগ প্রধান। আত্মপরিচয় এবং আত্মস্বার্থ কতখানি বিসর্জন দিয়ে শেখ হাসিনার সেবক হয়ে ওঠাও এক পরম গৌরবের।
পিতার নিত্য সাহচর্যে ছিলেন না শেখ হাসিনা।
রয়েছে তার ঘটনা পরস্পরা ও অশ্রুতপূর্ব
বিরল বিষাদময় ঘটনা।
'৫৩
সালে মুজিব আরমানিটোলাস্থ ৮/৩, রজনীবোস
লেনে এক আত্মীয়ের বাসা
নিয়ে আসেন নিজ পরিবারকে। সর্বংসহা, ধৈর্যের প্রতিমূর্তি, শত দুঃখ-কষ্টের
মধ্যেও যাকে দেখা যায়নি এক মুহূর্তের তরে
বিচলিত, সংগ্রামী স্বামীকে অহর্নিশ প্রেরণাদানকারী, মরণেও হয়েছেন যার সঙ্গী, সেই রমনী ফজিলাতুন্নেসার পরিবারের গল্পে অশ্রসজল হয়ে ওঠে আজও শেখ হাসিনার চোখ।
'৫৪
সালে মুজিব মন্ত্রী হলে রজনীবোস লেন ছেড়ে মিন্টোরোডের সরকারি বাসায়। কিন্তু সুখ বেশী দিন সইলো না। তারপর '৫৮ সেগুনবাগিচার বাসায়।
শেখ
হাসিনা সদা হাস্যোচ্ছ্বল এক প্রাণময়ী নারী,
পুরুষোত্তম পিতার সংগ্রামী আদর্শ আর সর্বংসহা মায়ের
অসীম ধৈর্যই বুঝি যার জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যাবার পুঁজি। আজ পিতার সোনারবাংলা
গড়ার দৃপ্ত শপথ নেয়া তৃতীয়বারের প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা যখন বিয়ের পিঁড়িতে, তখন পিতা শেখ মুজিব ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী।
'৬৭
সালের কথা। ফজলুল হক হলের ভিপি
এমএ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ের বন্দোবস্তটা মূলত তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতারাই করেছিলেন। আত্মীয়-পরিজনহীন বিয়ের আসরের নাটকীয় পরিবেশ হয়তো কোন দিন মুছে যাবার নয়। চট্রগ্রামে বিবাহোত্তর সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে যার মধুরেণ সমাপয়েৎ।
'৬৭
সালে ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদ নির্বাচনে ভিপি পদে শেখ হাসিনার জয়ের খবরটিও পৌঁছেছিল পিতা যখন কারাগারে অন্তরীণ। আগরতলা ষষড়যন্ত্র মামলার পর একাত্তর। ধানমণ্ডির
৩২ নম্বর ছেড়ে ১৮ নম্বর রোডের
বাসাতে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রহরায় অন্তরীণের দুঃসহ দিনগুলোর কথা।
১
এপ্রিল থেকে এম এ ওয়াজেদ
মিয়া শাশুড়ি, স্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও শেখ রাসেলকে
নিয়ে খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ায় একটি বাসায় ওঠেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডা, ওয়াদুদের তত্ত্বাবধানে ২৭ জুলাই রাত
৮টায় জন্ম হয় জয়ের। পাশে
ছিলেন লিলি ফুপু বঙ্গবন্ধুর ছোট বোন এটিএম সৈয়দ হোসেনের স্ত্রী)।
নানী
ফজিলাতুন্নেসা মুজিব আদুরে নাম রাখেন স্বামীর সঙ্গে মিলিয়ে সজিব। শেখ হাসিনা তার সঙ্গে জুড়ে দেন তার স্বামীর নাম ওয়াজেদ। মায়ের ন্যায় সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশের আগামী
কাণ্ডারি। এখানেই জন্মের সার্থকতা জাতির জনক কন্যা শেখ হাসিনার। শুভ জন্মদিন।
সোহেল সানি -লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
Collected From বিডি প্রতিদিন

Comments
Post a Comment